ঢাকাশুক্রবার , ২৮ নভেম্বর ২০২৫
  1. অপরাধ ও দুর্নীতি
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. কৃষি
  6. খেলাধুলা
  7. গ্রাম-গঞ্জ-শহর
  8. জাতীয়
  9. ধর্ম ও ইসলাম
  10. বিজ্ঞপ্তি ও বিজ্ঞাপন
  11. ভূমি
  12. রাজধানী
  13. রাজনীতি
  14. শিক্ষা ও ক্যাম্পাস
  15. স্বাস্থ্য ও জীবন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কারাগারে মাদক সিন্ডিকেট! কারারক্ষীদের যোগসাজশে নেশার বাজার

প্রতিবেদক
Daily Somor Diganta
নভেম্বর ২৮, ২০২৫ ৭:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নিজস্ব প্রতিবেদক,ময়মনসিংহঃ

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার শেষ স্তম্ভ—কারাগার। এখানে আইনের শাসন, সংশোধন ও সর্বোচ্চ শৃঙ্খলার পরিবেশ থাকার কথা। কিন্তু ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাম্প্রতিক বাস্তবতা যেন ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরছে। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে সক্রিয় এক ভয়ঙ্কর মাদকচক্র পুরো কারাগারব্যবস্থাকে গ্রাস করে ফেলেছে। অভিযোগ—কারারক্ষীদের একটি অংশ সরাসরি এই চক্রকে সহায়তা করছে, আর টাকার বিনিময়ে মাদকদ্রব্য ঢুকছে বন্দিশালার ভেতর। এর ফলে সংশোধনাগার আজ পরিণত হয়েছে ‘গোপন নেশার বাজারে’—যেখানে নিরাপত্তা,নৈতিকতা,আইন—সবকিছু যেন টাকার সামনে পরাজিত। দায় স্বীকারেও দায় এড়ানো নেই—স্বীকারোক্তিতে প্রশ্নের ঝড়! কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মোঃ মনির হোসেন চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন—“কারাগারে শতভাগ মাদকমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। দায়ও এড়ানোর উপায় নেই।” প্রশ্ন জাগছে—

যদি কারা প্রশাসনই নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করে,তবে সমাধান কোথায়? দায় নেবে কে?

কারাগারেই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়—তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কী? কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে নেই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা! বন্দিদের সামান্য ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ অভিযোগে তল্লাশি,মারধর বা শাস্তি দেওয়া হলেও মাদক প্রবেশে যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ, সেই কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানোর বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মাদক সরবরাহ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের নাম নতুন করে এসেছে—১.কতিথ মোবাইল ফোন কন্ট্রোলার কাইয়ুম,তিনি বন্দিদের কাছে মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি ও মাদক পৌঁছানোর “ভেতরের সার্ভিসিং” এর পরিচালনাকারী। ২.কারারক্ষী রিপন–অভিযোগ টাকার বিনিময়ে ইয়াবা,গাঁজা,এমনকি ফেনসিডিল পর্যন্ত পৌঁছে দেন নানা উপায়ে। এই দুইজনকে সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী ও কারা-সংশ্লিষ্ট সূত্র।

টাকার বিনিময়েই ‘ভালো থাকা’—বন্দিদের আরেক লোমহর্ষক বর্ণনাঃ কারাগারে যদি বন্দিরা একটু ভালো জায়গায় থাকতে চান—

ঘুষ দিতে হয় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। ক্যান্টিনে খাবার কিনতে গেলে—সরকারি দামের তুলনায় ২–৩ গুণ বেশি দাম দিতে হয়! সরকারি খাবার—অতিরিক্ত নিম্নমানের,মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন বন্দিরা। জামিনে মুক্তি পাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাবেক বন্দি জানান—“কারাগারে যেকোনো সেবা নিতে হলে দিতে হয় দুই–তিন গুণ টাকা। আর যার কাছে বেশি টাকা থাকে—সে মাদক থেকে শুরু করে সবধরনের সুবিধাই পেয়ে যায়। টাকা নেই? তাহলে শুধু নির্যাতন,অন্যায়,আর অমানবিক পরিবেশই ভাগ্য।” কারাগারের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ‘গোপন নেটওয়ার্ক’—মাদক আর সেবার জন্য আলাদা ‘ট্যারিফ’। কারা-সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়—কারারক্ষীদের একটি অংশ,মোবাইল কন্ট্রোলার,বন্দিদের দালাল—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে ভেতরে-বাইরে। যে ট্যারিফগুলো নিশ্চিত হয়েছে—ইয়াবা সরবরাহ:নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন দাম ভালো কক্ষ / ভালো ব্লক: ২০০০–৩০০০ টাকা! ক্যান্টিন পণ্য:

দ্বিগুণ–তিনগুণ দাম! মোবাইল ব্যবহারের ‘সুবিধা’: আলাদা চার্জ! আরও বড় টাকা দিলে—সম্পূর্ণ ‘ফ্রিল্যান্স সুবিধা’,অর্থাৎ মাদক ও অনৈতিক সেবা পর্যন্ত! এই নেটওয়ার্কে যারা নামি—তারা আগে-ভাগেই নিরাপত্তা পায়। আর যারা অভিযোগ করে—তাদের উপর নেমে আসে হয়রানি। সিসিটিভি দুর্বল—রোটেশন নেই—গোয়েন্দা নজরদারি অকার্যকর! অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে— কারাগারের সিসিটিভি গুলো সময়ের বেশিরভাগ অংশই অকার্যকর।

একই দায়িত্বে বছরের পর বছর একই কারারক্ষী—রোটেশন নেই! আকস্মিক তল্লাশি খুবই কম।

অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ “দেখেও না দেখার” ভান করে! এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি—কারাগারেই যদি নিরাপদ না হয়? তাহলে নিরাপত্তা কোথায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন—“কারাগারে মাদকচক্র মানে শুধু কারা প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়—এটি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতার নগ্ন প্রমাণ।” কারা সদস্যরাই যদি মাদক সিন্ডিকেটে যুক্ত হন—তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসই বা কিভাবে বজায় থাকবে? জনগণের দাবি—দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি,স্বচ্ছ তদন্ত এবং ডিজিটাল নজরদারি। সচেতন নাগরিক সমাজ,মানবাধিকার সংগঠন,আইন বিশেষজ্ঞরা একযোগে যে ৭টি দাবি তুলেছেন—

১.অভিযুক্ত কারারক্ষীদের অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত। ২.স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন। ৩.কারাগারের সিসিটিভি পুরোপুরি আধুনিকীকরণ। ৪.কারারক্ষীদের রোটেশন বাধ্যতামূলক করা। ৫.মোবাইল কন্ট্রোল সেক্টরে কঠোর নজরদারি। ৬.প্রতিটি অভিযোগে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ও জবাবদিহিতা। ৭.মাদক প্রবেশকে ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ বলা বন্ধ করে দায় নির্ধারণ। কারাগারের অন্ধকার চক্র ভাঙা এখন সময়ের দাবি। কারাগার শুধু শাস্তির জায়গা নয়—এটি সংশোধনের নিরাপদ পরিবেশ।

কিন্তু সেখানে যদি মাদক বেচাকেনা,ঘুষ-দুর্নীতি, অমানবিকতা,দুর্বল নজরদারি—সব একসঙ্গে বিকশিত হয়,তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুঁশিয়ারি। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে যা ঘটছে—তা কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। সরকারের হাইকমান্ডের দায়িত্ব এখন—এই অন্ধকার চক্র ভেঙে কারাগারকে তার প্রকৃত পরিচয়ে ফিরিয়ে আনা।

Facebook Comments Box