দৈনিক সমর দিগন্ত ডেস্ক:
সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে দেশের নারী সমাজ। পুরুষের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে এগিয়ে নিচ্ছে এদেশের নারীরা। কিন্তু খুব সহজেই সব নারীদের জীবনে সফলতা আসেনি। এজন্য করতে হয়েছে সংগ্রাম আর প্রাণপণ চেষ্টা। অনেকের রয়েছে অনেক করুন ইতিহাস। সব বাঁধা আর সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতাকে পিছনে ফেলে যারা সফল হয়েছে তারাই তো অদম্য নারী। সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে অথবা ব্যক্তি জীবনে সফলতা পেয়েছে এমন নারীদের মধ্যে সরকার ৫টি ক্যাটাগরীতে অদম্য নারী সম্মাননা প্রদান করে থাকে। সংগ্রামী নারীদের জন্য এটি বিরল একটি সম্মাননা। সরকার এ সম্মাননা উপজেলা পর্যায় থেকে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে প্রদান করে থাকে। প্রতিবছরের ন্যায় এবছর ও কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার ৫ জন নারী ৫টি ক্যাটাগরীতে পাচ্ছেন অদম্য নারী সম্মাননা।
৯ ডিসেম্বর (সোমবার) বেলা ১১ টায় বেগম রোকেয়া দিবস ও অদম্য নারী পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক দপ্তর থেকে নিবার্চিত ৫ নারীকে উপজেলা হলরুমে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ পত্র প্রদান করা হয়।

উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মোঃ শারফুল ইসলামের সঞ্চালনায় এ সময় বক্তব্য রাখেন উপজেলা নিবার্হী অফিসার রুপম দাস, সহকারী কমিশনার ভূমি রিফাত জাহান, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দত্ত, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ শাহজাহান, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোছাঃ জাহানারা বেগম, কটিয়াদি ফেকামারা ফাযিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কাশেম বিপ্লব, জামায়াতের পৌর আমীর মাওলানা নাজমুল হক, সেক্রেটারি মোজাহিদুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির নেতা আমিনুল হক জজ, পাকুন্দিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি খন্দকার আসাদুজ্জামান, উপজেলা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সাবেক পৌর কমিশনার প্রমুখ।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দত্ত, বলেন সমাজের বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী এসকল নারীদের “বেগম রোকেয়া দিবস” ও “অদম্য নারী পুরস্কার” সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে তাদেরকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। উদ্দেশ্য হলো এসকল জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের দেখে অন্য নারী এগিয়ে আসে এবং উৎসায়িত হয়। উপজেলা নিবার্হী অফিসার জনাব মোঃ বিল্লাল হোসেন বলেন এ ধরনের “অদম্য নারী পুরস্কার” সম্মাননা প্রদান নারীদের জন্য সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নারীদের জন্য এটি জাতীয় সম্মাননা এবং আর্তমযার্দার বিষয়। এবার যারা সম্মাননা পাচ্ছেন তাদের সকলকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
এ বছর যে ৫জন নারী মনোনিত হয়েছেন তারা হলেন: শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী ক্যাটাগরীতে মনিরা আজম ইতি, পিতা: মৃত মো: হাসমত আলী মৃধা, মাতাঃ জাহিমা খাতুন। তিনি পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সরকারী গুরুদয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হতে অর্নাস সহ মাস্টার্স করেন। চার ভাই বোনের সংসারে বাবা মারা যাওয়ায় নিজে টিউশনি করে লেখাপড়া করেছেন। স্নাতক ২য় বর্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। সংসার সামলিয়ে অর্নাস-মাস্টার্স করেন। ২০১৮ সালে চাকুরী হয়। বর্তমানে তিনি বড় সৈয়দগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি ২০২৫ সালে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ও গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে আন্ত-পিটি আই সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তিতে ঢাকা বিভাগে প্রথম ও জাতীয় পর্য়ায়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।
সফল জননী ক্যাটাগরীতে মেরাজুন্নাহার। তিনি উপজেলার দগদগা গ্রামের প্রধান শিক্ষক (অবঃ) মৃত মোঃ সিরাজুল হক এর সহধমীর্নি। মহিয়সী এই সফল জননী ৭ সন্তানের মধ্যে ১ম মেয়ে স্নাতক, সহকারী শিক্ষক প্রাথমিক, ২য় মেয়ে স্নাতক, প্রধান শিক্ষক প্রাথমিক, ৩য় মেয়ে এইচএসসি, ৪র্থ মেয়ে স্নাতক, সহকারী শিক্ষক প্রাথমিক, ৫ম মেয়ে স্নাতক, সহকারী শিক্ষক প্রাথমিক, ৬ষ্ঠ ছেলে বিএসএস অর্নাস-মাস্টার্স, ব্যবস্থাপক , জনতা ব্যাংক, মিঠামইন শাখা, ৭ম ছেলে বিএসসি ইজ্ঞিনিয়ার, ডেপুটি ম্যানেজার, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী লিঃ (জিটিসিএল) ঢাকা।
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী ক্যাটাগরীতে নাম মোছা: সাদিয়া আক্তার, পিতা: মো: হেলাল উদ্দিন, মাতা: মোছ:রোকিয়া, গ্রাম: চরতের টেকিয়া, পো: তালতলা বাজার, উপজেলা: পাকুন্দিয়া, জেলা: কিশোরগঞ্জ, তারা ০৩ ভাই ০১ বোন। ৯ম শ্রেণী লেখাপাড়া করা অবস্থায় ১৮ (আটার), বছর বয়সে আমার বিবাহ হয়। বিয়ের পর খুবই কস্ট করে বি.বি.এস পাশ করি। এর মধ্যে আমার ২ টি সন্তান জন্ম হয়। ২০১৬ সাল থেকে আমার স্বামীর সাথে সর্ম্পকের অবনতি হওয়ায় আমার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। আমি বাবার বাড়ীতে অবস্থান করি। তখন আমার ও ২ সন্তানের ভরণপোষণ এর জন্য কেউ ছিল না। অতি কস্টে খেয়ে না খেয়ে জীবন ধারন করি। ২০১৮ সালে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় হতে তিন মাস মেয়াদি বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত টাকা ও কিছু টাকা ধারদেনা করে পার্লার দেই। সিমান্তা পার্লার দিয়ে আমার সংসার চালাচ্ছি। প্রথম সন্তান কন্যা এইচ.এস.সি ২য় বর্ষ এবং দ্বিতীয় সন্তান আবদুল্লা আল সায়ান ৪র্থ শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। নিজের সংসার পরিচালনা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দোকান ভাড়া ৩০০০/- (তিন হাজার), টাকা বাসা ভাড়া ৪০০০/-(চার হাজার), টাকা প্রদান করি। বর্তমানে একজন সহযোগী নিয়ে পার্লার এর কাজ করি। যখন আমার এক বেলা খাবার এর খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হতো বর্তমানে আমি সফল আত্নকর্মী হিসাবে ২০/২৫ হাজার টাকা মাসিক আয় করি।
অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী ক্যাটাগরীতে নাম: ইসরাতুন নাঈম, স্বামীর নাম: নাজমুল হুদা, গ্রাম: দাওরাইট, ডাক: আংগিয়াদী , ইউনিয়ন: এগারিসন্দুর, উপজেলা: পাকুন্দিয়া, জেলা: কিশোরগঞ্জ।
সন্তান: দুই ছেলে। বড় ছেলে এইচএসসি ক্যান্টম্যান্ট কলেজ গাজীপুর ও ছোট ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে আছিয়া বারী বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৮ম শ্রেণি। শুরুর দিকে গ্রামের অনান্য গৃহিণীর মত সাধারণ একজন গৃহিনী ছিলেন ইসরাতুন নাঈম। প্রায় বছর তিনেক আগে বীজ সংরক্ষন এর উপর ১০টি সেশনের একটি প্রশিক্ষনের সুযোগ প্রায় এ গৃহিণী । এ প্রশিক্ষণ থেকে সে বীজ সংরক্ষণ, নার্সারী স্থাপন, জৈব সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন এই ৩টি বিষয় ভালভাবে আয়ত্বে নেন। এর পর থেকে শুরু হয় তার উদ্দোক্তা হিসেবে নিজেকে তৈরী করার পালা বাড়িতে পরিত্যাক্ত গরুর খাবারের ২ রিং এ ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন এরপর এই সার বিক্রির টাকা দিয়ে ১০টি রিং ক্রয় করে তাতে ও জৈব সার উৎপাদন শুরু করে পরবতীতে ২০টি, ৪০টি ১০০টি বর্তমানে তার ১০০টি রিং ও ৪০ চেম্বার এবং ১০০টি ক্যারেট সব মিলিয়ে প্রতি মাসে তিনি প্রায় ৬ টন সার উৎপাদন করে যাচ্ছে যা দেশের মাটি স্বাস্থ্য রক্ষায় এবং ভর্তকী মূল্য সার ক্রয় চাহিদা পুরণে এক গুরত্বপূন্য ভুমিকা রেখে যাচ্ছে ।এই প্রশিক্ষনে আরেকটি দিক নার্সারী স্থাপন অল্প অল্প চারা উৎপাদন করতে করতে এখন একটি বড় নার্সারীতে পরিনত করেছেন যেখানে প্রতি বছর ৫০০০ফলজ, ৮০০০ বনজ, ৩০০০হাজার ভেষজ ১০০০ অর্নামেন্টাল চারা উৎপাদন করে থাকেন, উপজেলা পর্যায়ে বাৎসরিক কৃষি মেলায় সেরা নার্সারীর পুরস্কার ও পান তিনি। এই প্রশিক্ষনে আরেকটি দিক বীজ সংরক্ষন ৫০ কেজি ১০০ কেজি বীজ সংরক্ষনের মাধ্যমে এলাকায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ধান বীজ বিক্রির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এখন প্রতি মৌসুমে উফশী জাতের প্রায় ১০০ টন বীজ সংরক্ষন করে থাকে যা সরকার নিবন্ধকৃত লাইসেন্স নিয়ে প্যকটেজাত করে নিজ জেলা সহ গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার অধিকাংশ বাজারে বিক্রি করছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছে ধানের নতুন নতুন জাতে পৌছে দিতে গুরত্বপূন্য ভুমিকা রাখছে। আজ ৫ বছর পূর্বে ও যে গৃহিনী নিজ বাড়িতে রান্না বান্না করে সময় পার করতেন আজ সেই গৃহিনীর চেষ্টা দৃঢ়তা আর ইচ্ছে শক্তিকে ভর করে নিজকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায় আজ তার বিভিন্ন কার্যক্রমে ৬ জন শ্রমিক স্থায়ী ভাবে কাজ করে এবং ২০ জন নারী হাজিরা ভিত্তিক কাজ করে। সে নিজেও স্বাবলম্বী হলো ২০-২৫ জন অসহায় নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। দেশ বিদেশ হতে বিভিন্ন লোকজন আমার কেঁচো সার তৈরি পরির্দশনে আসেন। বর্তমানে তিনি স্বচ্ছল ভাবে জীবন যাপন করছেন।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী ক্যাটাগরীতে নাম ফেরদৌস বেগম, পিতা: জিন্নত আলী, মাতা: আনোয়ারা বেগম, গ্রাম: কাগারচর, পো: মঠখোলা, উপজেলা: পাকুন্দিয়া, জেলা: কিশোরগঞ্জ, তারা চার বোন, চার ভাই মধ্যে আমি ৫ম সন্তান। ৮ম শ্রেণী লেখাপাড়া করা অবস্থায় ১৫ (পনের) বছর বয়সে আমার বিবাহ হয়। বিবাহর পর হতে আমি স্বামীর বাড়ীতে বিভিন্ন জনসেবা মূলক কাজ করি। বর্তমানে আমার তিন ছেলে প্রথম ছেলে বয়স ৩৮ বছর, দুবাই প্রবাসি, ২য় ছেলে বয়স ৩৬বছর সৌদি প্রবাসি ৩য় ছেলে বয়স ২৬ বছর, ইউরোপ প্রবাসী। আমি গত ২০২১সাল হতে বুরুদিয়া ইউনিয়নের ১,২,৩ নং ওর্য়াডে মহিলা ইউপি সদস্য। আমার প্রবাসি ছেলেদের আয়ের একটা বিরাট অংশ বিভিন্ন সমাজ গঠনে কাজে ব্যবহার করি। যেমন:-
১। অসহায় ছাত্র/ছাত্রীদের লেখাপাড়ার খরচ বহন করি।
২। অসচ্ছল লোকদের চিকিৎসার খরচ বহন করি।
৩। বাল্য বিবাহ,যৌতুক, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করি।
৪। মসজিদ, মাদ্রাসায় নিয়মিত অনুদান প্রদান করি।
৫। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি দূর করতে ভুমিকা পালন করি।
৬। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর আত্ন-কর্মসংস্থানের জন্য উৎসাহ প্রদান করি।
এছাড়া পাকুন্দিয়া থানায় যোগদানকারী অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস.এম আরিফুর রহমান, প্রাণী সম্পদ কমকর্তা মোঃ আলী আকবর, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ড. দৌলওয়াত হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম, পল্লী বিদ্যুৎ পাকুন্দিয়া অফিসের ডিজিএম নিতাই দাস, উপজেলা আনসার ও ভিডিপির কমান্ডার, ফায়ার সার্ভিসের অধিনায়ক, আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার পাকুন্দিয়া প্রতিনিধি ম. মুহিবুল্লাহ বচ্চন, শতাব্দীর কণ্ঠ পত্রিকার পাকুন্দিয়া প্রতিনিধি আবু হানিফ, চলনবিলের আলোর জেলা প্রতিনিধি মোঃ স্বপন হোসেন, দৈনিক সমর দিগন্ত অনলাইন পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার শফিকুল ইসলাম শামীম ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মোঃ লুৎফুর রহমান দপ্তরের আওতাধীন সকল কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

