
মোঃ স্বপন বেপারী, লৌহজং প্রতিনিধি:
বিক্রমপুর অঞ্চল একসময় পরিচিত ছিল শীতের সকালে খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর রসালো পিঠার ঐতিহ্যে। গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুর গাছ, ভোরে গাছির হাঁক, কলস ভরা টাটকা রস এসব দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রাম ও আঞ্চলিক সড়ক প্রশস্তকরণের নামে বছরের পর বছর নির্বিচারে কাটা হয়েছে অসংখ্য খেজুর গাছ। কিন্তু যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে, সে তুলনায় নতুন করে খেজুর গাছ রোপণ করা হয়নি বললেই চলে। ফলে কমে গেছে খেজুরের রস সংগ্রহ, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বহু গাছির পেশা, আর হারিয়ে যাচ্ছে শীতকালীন ঐতিহ্যবাহী খাবার সংস্কৃতি।
শুধু একটি গাছ নয়, একটি সংস্কৃতি খেজুর গাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয় এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনীতির অংশ। খেজুরের রস থেকে তৈরি হতো নানা ধরনের রসালো পিঠা ও খাবার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রসের, পাটিসাপটা, রসের দুধচিতই, রসের ভাপা পিঠা, রসের তেলপিঠা, রসের চন্দ্রপুলি, খেজুরের রসের ক্ষীর ও পায়েস, রস দিয়ে তৈরি খেজুরের গুড় ও ঝোলা গুড়, এই খাবারগুলো শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং শীতকালীন সামাজিকতা ও পারিবারিক মিলনের অংশ ছিল। বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী আজ এসব নামই জানে না এটাই সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয়।

ভেজাল গুড়ের দাপট, আসল গুড় সংকটে রাজশাহী অঞ্চল একসময় খেজুরের গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দেখা গেছে, কিছু কারখানায় চিনি, কেমিক্যাল ও রং মিশিয়ে ভেজাল খেজুরের গুড় তৈরি করা হচ্ছে, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত খেজুর গাছ ও রসের সংকটই এই ভেজালের মূল কারণ। একজন গাছি বলেন, গাছই যদি না থাকে, তাহলে আসল গুড় বানাবো কী দিয়ে? রস কমে গেলে ভেজাল বাড়বেই। কেন খেজুর গাছকে বৃক্ষরোপণে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি, বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে খেজুর গাছকে প্রথম সারিতে আনার পেছনে একাধিক যৌক্তিক কারণ রয়েছে, এটি দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব গাছ অল্প পরিচর্যায় দীর্ঘদিন ফলন দেয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে (গাছি, গুড় প্রস্তুতকারক) দেশীয় ঐতিহ্য ও খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খেজুরের রস ও গুড় বিদেশে বাংলাদেশের একটি অনন্য পরিচয় হতে পারে।
সরকারের প্রতি দাবি স্থানীয় জনগণ ও সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি,সড়ক নির্মাণে খেজুর গাছ কাটলে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন খেজুর গাছ রোপণ জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবসে খেজুর গাছকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হোক,গাছি প্রশিক্ষণ ও খেজুর রস সংগ্রহে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি চালু ভেজাল গুড় উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে অচিরেই খেজুরের রস ও রসালো পিঠা শুধু বইয়ের পাতায় কিংবা স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতন হওয়ার সময়।