স্টাফ রিপোর্টার:
ময়মনসিংহে সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সরকারের খাস জমি জবর দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করার অভিযোগ উঠেছে। নগরীর পুরাতন গুদারাঘাট কালীবাড়ী এলাকায় টাউন মৌজায় ১নং খাস খতিয়াভুক্ত সরকারি জমিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাল দলিল ও ভুয়া রেকর্ড সৃষ্টি করে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় নগরবাসীর মাঝে এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে-নগরীর কালীবাড়ী পুরাতন গুদারাঘাট এলাকায় সরকারের ১নং খাস খতিয়ান ভুক্ত জমি অবৈধভাবে ক্ষমতা প্রভাবে দখলে নিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ, জমি ক্রয় বিক্রয় করছে বাংলাদেশ বেতার বান্দরবান কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (অনুষ্ঠান) আহাদ মো. সাঈদ হায়দার। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকারি খাস জমি রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
জেলা প্রশাসক বরাবরে স্থানীয় একজন অভিযোগকারী জানান-কালীবাড়ী রোডস্থ পুরাতন গোদারাঘাট এলাকায়, এস.কে. হাসপাতালের বিপরীত পাশে অবস্থিত টাউন মৌজার সিএস ৯৫ নং খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত সিএস ২৭৫৭ ও এসএ ১০৬৪০ নং দাগভুক্ত প্রায় ১৯৩০ অযুতাংশ ভূমি একসময় মুক্তাগাছা জমিদার মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর মালিকানাধীন ছিল। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী উক্ত ভূমি সরকার কর্তৃক অধিগৃহীত হয় এবং সিএস, এসএ ও সর্বশেষ বিআরএস রেকর্ডে সরকারের নামে ১নং খাস খতিয়ানে খাস জমি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।
সরকারি রেকর্ডে জমিটি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অভিযুক্ত সরকারী কর্মকর্তা আহাদ মো. সাঈদ হায়দার উক্ত জমি অবৈধভাবে দখলে নিয়ে সেখানে মাটি ভরাট করে চারদিকে ইটের প্রাচীর নির্মাণ, পাকা বসতঘর স্থাপন এবং বহুতল ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে ছয়তলা ভবনের ফাউন্ডেশনসহ প্রথম তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি জমিতে এ ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ প্রকাশ্যেই চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর হস্তক্ষেপ চোখে পড়েনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি খাস জমিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখানোর উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার ভাই আহাদ মো. শওকত হায়দারের যোগ সাজশে ১৯৯২ সালের ৮ মার্চ একটি জাল ‘সাব কবলা’ দলিল (দলিল নং-৩৭৬৫) তৈরি করা হয়। উক্ত দলিলে জবেদ আলী সরকার নামের এক ব্যক্তিকে ভূয়া দাতা হিসেবে দেখিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার মা মিসেস সেতারা বেগমকে গ্রহিতা হিসেবে উল্লেখ্য করা হয়। তবে অনুসন্ধানে স্থানীয় ভূমি অফিস ও জেলা সেটেলমেন্ট রেকর্ডরুমে কথিত এসএ ৪৩০৪ নং খতিয়ানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যা দলিলটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাল দলিলের ভিত্তিতে পরবর্তীতে বিআরএস ৫২৩৩ নং খতিয়ান সৃজন করা হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ভূমি অফিস তা ব্লক করে দেয়। ফলে অভিযুক্ত পক্ষ এখন পর্যন্ত উক্ত জমির নামে কোনো বৈধ হোল্ডিং খুলতে পারেননি কিংবা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভূমি সহকারী কর্মকর্তার হোল্ডিং বহিতেও জমিটিকে এখনো ‘খাস খতিয়ানের জমি’ হিসেবেই উল্লেখ করে রাখা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, এ ঘটনাই একমাত্র নয়। একই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ টাউন মৌজার এসএ ১০৬৪০ দাগভুক্ত সরকারি জমি ছাড়াও চরঈশ্বরদিয়া মৌজার এসএ ১৩৮১ ও বিআরএস ৩৩১০ নং দাগভুক্ত ‘নদী’ শ্রেণির সরকারি জমিও দখল করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের শামিল।
অভিযোগকারীদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সরকারি খাস জমি দখল ও সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সরকারের আনুমানিক ১০ কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাতের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ লঙ্ঘনের পাশাপাশি ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ধারা ১১ এবং দন্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগটি আমলে নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক স্থানীয় এসিল্যান্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলে এসিল্যান্ড জমিটি পুণরুদ্ধারে পৌর ভূমি অফিসার ও সার্ভেয়ারের সমন্বয়ে একটি তদন্ত টিম প্রেরণ করলে তারা সেখানে গিয়ে মাপ-যোগ করে জমিটি সরকারী ব্যবস্থাপনায় আনাসহ প্রয়োজনীয় আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে সহকারী ভূমি সৈয়দা তামান্না হুরায়রা জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা সেখানে গিয়ে জমিটি পরির্দশন করি। তিনি জানান-জমিটি ১নং খাস খতিয়ান ভূক্ত হলেও একই জমি ব্যক্তি মালিকানাও বিআরএস রেকর্ড হওয়ায় দুকোর হিসাবে গন্য করা হচ্ছে। আমরা আমাদের তদন্ত রিপোর্ট জেলা প্রশাসককে পাঠানোর পর তিনি যে নির্দেশনা দিবেন সেই সেই মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

