
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই নির্বাচন হচ্ছে মা-বোনদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। এই নির্বাচন হচ্ছে শিশুর স্বপ্ন মেলে ধরার নির্বাচন। এই নির্বাচন হচ্ছে যে পচা, ঘুণেধরা রাজনীতি ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে, তার বিদায় জানানোর নির্বাচন।
তিনি বলেন, এটি ২০১৮ কিংবা ২০১৪ সালের নির্বাচন নয়। আগামী ১২ তারিখ এ দেশের আপামর জনগণ লালকার্ড দেখাবে। এই যে জনস্রোত, এটা শুধু কক্সবাজারে নয়, এটা পুরো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দৃশ্য। এর আগে জুলাই তরুণরা জানিয়ে দিয়েছে, আমরা ইনসাফের পক্ষে, পুরনো রাজনীতির পক্ষে নেই, ফ্যাসিবাদের পক্ষে নেই। যারা জুলাই চেতনা ধারণ করে না, আমরা তাদের পক্ষে নেই, বলেন আমীরে জামায়াত।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার সদরের কক্সবাজার বাহারছড়া মুক্তিযোদ্ধা চত্বর মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ও কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমেদ আনুয়ারীর সভাপতিত্বে ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ঢাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ, এনসিপি নেতা ডাক্তার ফাহমিদা মিতু প্রমুখ।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী শহর জামায়াতের আমীর আব্দুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী ভিপি শহিদুল আলম বাহাদুর, জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান, জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি এডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, এবি পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গীর কাশেম, এনসিপি, খেলাফত মজলিসসহ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ১১ দলীয় নেতারা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ডাকসু থেকে শুরু, আপাতত জকসুতে এসে থেমেছে। দেখেন নাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। যেখানেই এখন নির্বাচন, সেখানেই হারু পার্টি। হারার ভয়ে এখন সব নির্বাচন ঠেকিয়ে দেয়।
বিরোধীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জোর করে মানুষের মন দখল করবেন?- তা হবে না। মাহমুদা কিন্তু বলেছে, তাকে নিয়েও বুলিং করা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে। সে কে? তাদের (জুলাই যোদ্ধা) কারণেই তো আজকে অনেকে জেল থেকে বের হয়েছে। তাদের কারণে অনেকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের কারণে অনেকে দেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন। আজকে সেই উপকারকে আপনি উপহাস করেন? এটা তাদের জন্য বুমেরাং হবে, ইনশাআল্লাহ।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি ইনশাআল্লাহ, জনগণ ১৩ তারিখ থেকে নতুন একটি বাংলাদেশ পাবে। সেদিন আমাদের মায়েদেরকে মাথার উপর তুলে মর্যাদা দেবো, ইনশাআল্লাহ। তাদের ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে সবখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
মায়েদের মর্যাদার বিষয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা মায়েদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এই মায়েদেরকে যে জাতি সম্মান করবে, আল্লাহ তায়ালা সে জাতিকে সম্মান করবেন, ইনশাআল্লাহ। আর এই মায়েদেরকে যারা সম্মান করতে জানবে না, তারা আল্লাহর কাছ থেকে কোনো সম্মান পাবে না।
তরুণ ও জুলাইযোদ্ধাদের দাবির বিষয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, জুলাই যোদ্ধারা রাস্তায় নেমে বলেনি, আমাদের বেকার ভাতা দেন। তারা বলেছে, আমাদের কাজ দেন। আমার পাওনা কাজটি আমার হাতে তুলে দেন। আমু-মামুর টেলিফোন আর কোটায় আমার মেধা যেন হারিয়ে না যায়। এই ছিল তাদের দাবি।
তিনি আরও বলেন, যুবকরা বলেছে- আমার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমার যেটা প্রাপ্য, আমার হাতে সেটা দেন। আমরা যুবকদের বলছি পরিষ্কারভাবে, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে অপমানিত করবো না। আমরা তাদের প্রত্যেকটি হাতকে মজবুত করে গড়ে দেব,দেশগড়ার কারিগর হিসেবে। তারপর কাজ তুলে দিয়ে বলবো—এবার আগাও। এ দেশ তোমার। এবং চিৎকার দিয়ে বলবে—আমিই বাংলাদেশ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সেই বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক বানাতে চাই যুব সমাজকে। বন্ধুগণ, বিভিন্ন ধরনের অনেক কিছু রটায়। কারা করে এগুলো? যখন দেখে চতুর্দিকে অন্ধকার, তখন দিনকে রাত মনে হয়। কী করবে, কী বলবে- হিসাব খুঁজে পায় না। কিন্তু মনে রাখবেন, এ দিয়ে জনগণের ভালোবাসার জোয়ার ঠেকানো যাবে না। জনগণের দেহের ওপর চাবুক মারতে পারবেন, মনের ওপর চাবুক মারতে পারবেন না।
তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। তার প্রতিবাদ আমি করি। আমারও পিছু লেগেছে। ডাকাতের মতো, চোরের মতো পিছনে লেগেছে। সামনে থেকে মোকাবিলা করার সাহস নেই, তাই এখন পেছন থেকে লেগেছে। হ্যাঁ, পেছনের লোকেরা পেছনেই পড়ে থাকবে, সামনে যেতে পারবে না। ওরা পেছন থেকে চাবুক মারবে, সিংহ পুরুষের মতো সামনে যাওয়ার সাহস হবে না।
তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজেদের আদর্শ, কর্মসূচি, পরিকল্পনা, বক্তব্য ও চরিত্র নিয়ে আসুন। বলতে পারবেন? আমাদের দল, আমাদের সরকারই পারবে একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। তবে কেউ কেউ বলেছেন, টুটি চেপে ধরবে। বগলের তলে ঋণখেলাপি আর আপনি দেবেন বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত করে- পেঁচাও হাসবে এ কথা শুনে, বলেন আমীরে জামায়াত।
তিনি বলেন, জনগণ সব চালাকি বোঝে। জনগণের কেউ বোকা না। এখন রটাচ্ছে- কোন আমলে কোন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ১১ দল ক্ষমতায় এলে জামায়াতের নেতৃত্বে এদের সবাইকে বাদ দিয়ে দেবে। আমাদের অঙ্গীকার ইনসাফ কায়েম। যেদিন থেকে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে, সেদিন থেকে বাংলাদেশকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হবে, ইনশাআল্লাহ। এই বাংলাদেশ ‘উইল নট গো ব্যাক, উইল গো ফরওয়ার্ড’, ইনশাআল্লাহ।
আমীরে জামায়াত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, আমরা পেছনের দিকে তাকাবো না, সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। সেদিন থেকে আমরা সবার কাছে সততার আশা করবো, স্বচ্ছতার আশা করবো, দায়িত্বশীলতার আশা করবো। আমরা চাই না সরকারের কোনো অফিস দলীয় ঠিকানা হোক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের হবেন, কোনো দলের হবেন না।
তিনি বলেন, একবার আমরা সেটাই চাই- তারা দক্ষতার সাথে দেশকে সেবা দিয়ে চলুক। তখন যদি কেউ ব্যর্থ হয়, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অতীতের অনেক কিছু নিয়ে আমরা ছাড় দিতে পারি, কিন্তু কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে পারবো না। যেমন—আবু সাঈদের হত্যাকারীরা, আবরার ফাহাদের হত্যাকারীরা। এদের বিচার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় নেই। তাদের সহযোদ্ধা শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের জন্য কোনো দয়া-মায়া নেই। এটি ন্যায্যতার দাবি।
আমীরে জামায়াত বলেন, তবে কারো ওপর কোনো পাইকারি জরিমানা করা হবে না। ন্যায়-অন্যায় সবকিছু একসাথে মিশিয়ে ফেলার কোনো কর্মসূচি আমাদের নেই। তবে আমরা কথা দিচ্ছি, মানুষ হিসেবে তারা ভুল করতেই পারে। তারা যদি অনুতপ্ত হয়, ভুলের জন্য লজ্জিত হয়, তাহলে তাদের ব্যাপারটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবো, ইনশাআল্লাহ। এতগুলো মানুষ কোথায় যাবে? তাদের সাগরে ফেলতে পারবো না। আর এত মানুষকে জায়গা দেওয়ার মতো জেল বাংলাদেশে নেই। সবার লাগবে না। লেজ ধরে, পা ধরে টানাটানি না করে, কান ধরে টান দিলেই হবে- যাতে একজনের শাস্তি থেকে হাজার জন সুস্থ হয়ে যায়।
তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এই কক্সবাজার এখন পর্যন্ত কেন হংকং হতে পারলো না, কেন সাংহাই হতে পারলো না, কেন সিঙ্গাপুর হতে পারলো না? পারলো না অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও ব্যাংক ডাকাতদের কারণে। এরা জনগণ নিয়ে চিন্তা করে না। নিজেরা পড়ে আছে বাংলাদেশে, চৌদ্দ গোষ্ঠী পাঠিয়েছে বিদেশে। এরাই আমাদের দেশ লুটেপুটে শেষ করে দিয়েছে।
আমীরে জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, দেশ থেকে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে, তাদের পেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তা বের করে আনা হবে। এই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। যা ইনসাফভিত্তিকভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। কোনো মামা-খালু, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখা হবে না। যার যেটা পাওনা, তাকে সেটা পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের অপরিসীম সম্ভাবনার পর্যটন এলাকা ঠিকভাবে বিকশিত করা যায়নি। এখানে নিরাপত্তার অভাব, অপরাধ কেন- এটাকে ক্লিনজোন করা যায়নি ওই দুষ্টদের কারণে। যারা জনগণের অনুভূতি বিক্রি করে খেয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সব জায়গায় শিক্ষাই হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড। এই জায়গার মানুষের দাবি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। যদি চান, দোয়া করেন। বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু সার্টিফিকেট তৈরির ফ্যাক্টরি না। আমরা এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ বানাবে এবং একই সঙ্গে দেশগড়ার কারিগর বানাবে।
তিনি বলেন, আমরা শুধু একাডেমিক বা শুধু থিওরেটিক্যাল শিক্ষায় বিশ্বাস করি না। আমরা মোরাল ও প্রফেশনাল শিক্ষা আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দেব ইনশাআল্লাহ। কোনো গরিব শিশু শিক্ষা থেকে বাদ পড়বে না। ঐ শিশুর দায়িত্বও সরকারের। রাজার ছেলে রাজা হবে- এই রাজনীতির আমরা বিরোধী। যার যোগ্যতা আছে, সেই সেবক হবে। আমার একজন রিকশাচালক শ্রমিক ভাইয়ের সন্তান আগামীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, আগামীতে দুইটি ভোট। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’। আগে অনেকে ‘না’ বলেছিল, পরে জাতির ঠেলায় এখন আস্তে আস্তে ‘হ্যাঁ’ বলতে শুরু করেছে। এটা তাদের মুখের কথা না হয়ে বুকের কথা হোক- আমরা দোয়া করি। কিন্তু এবার কেউ ‘না’-এর পক্ষে দাঁড়ালে, জাতি তার কাছ থেকে হিসাব-নিকাশ বুঝে নেবে।
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি। ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব। আরেকটি ভোট হবে ১১ দলের ঐক্যবদ্ধ ন্যায়-ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায়।