আরিফ রববানী ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ সাবেক তিনবারের জাতীয় সংসদ সদস্যের জামানত বাজেয়াপ্ত করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।
বড় ধরনের রাজনৈতিক রদবদল ঘটিয়ে বিপুল ভোটে তিনি বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, এই আসনের সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম শোচনীয় পরাজয়ের পাশাপাশি নিজের জামানতও হারিয়েছেন।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সানজিদা রহমানের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, চারজন প্রার্থীর মধ্যে প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু বিএনপি (ধানের শীষ) পেয়েছেন ১লক্ষ ৭হাজার ৫শ ৭৭ ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট মনোনীত লিবারেল ডেমোক্রেটিস পার্টি (এলডিপি) এর
প্রার্থী ড. আওরঙ্গজেব বেলাল (ছাতা) প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪৫হাজার ৭শ ৯১ভোট, উপজেলার সাবেক এমপি বিএনপি থেকে বহিস্কৃত হয়ে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর নব্য যোগদানকারী ও মনোনীত প্রার্থী শাহ নূরুল কবীর (হাতপাখা) প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩২হাজার ৭শ ৩৪ভোট ও জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী সাবেক এমপি ফখরুল ইমাম (লাঙ্গল) প্রতীক নিয়েছেন পেয়েছেন ১হাজার ৭শ ১৯ ভোট।
নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে জামানত রক্ষা করতে হলে মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত আট ভাগের এক ভাগ (১২.৫%) থেকে একটি ভোট বেশি পেতে হয়। ময়মনসিংহ-৮ আসনে মোট প্রদত্ত ভোট ১ লাখ ৯২ হাজার ৬শ ৩২টি। সেই হিসেবে জামানত রক্ষায় প্রায় ২৪হাজার ভোটের প্রয়োজন থাকলেও ফখরুল ইমাম পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৭শ ১৯ ভোট। ফলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ফখরুল ইমাম এই আসনের একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। তিনি ১৯৮৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের এমন ভোট বিপর্যয় স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ড. আওরঙ্গজেব বেলাল দ্বিতীয় এবং বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে হাতপাখা প্রতীকে শাহ নূরুল কবীর তৃতীয় স্থান অধিকার করলেও জামানত খোয়াতে বসেছেন জাতীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী ও সাবেক এমপি ফখরুল ঈমাম।
ভোটার ও কেন্দ্রের পরিসংখ্যান সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৩লক্ষ ৪৫হাজার ৭শ ৪৬ জন মোট ভোটারের মধ্যে ১লক্ষ ৭৭হাজার ৯৭ জন পুরুষ, ১লক্ষ ৬৮হাজার ৬শ ৪৩জন নারী ও ৬জন তৃতীয় লিঙ্গ। প্রদত্ত ভোট সংখ্যা ১লক্ষ ৯২হাজার ৬শ ৩২টি। ভোট প্রদানের হার ৫৫.৭১ শতাংশ। বাতিলকৃত ভোট সংখ্যা ৪হাজার ৮শ ১১টি। ভোট কেন্দ্র: ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৯২টি কেন্দ্রের ৬২৮টি কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু এই বিজয়কে ঈশ্বরগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দিনভর উপজেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিলো।
ফলাফল প্রকাশের পর বিজয়ী হয়ে বিবৃতিতে প্রকৌশলী মাজেদ বাবু বলেন, “আমার প্রতি জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে যে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তা অটুট রাখতে আমি বদ্ধপরিকর। স্বল্প সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়ে জনতার যে অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়েছি, তার ঋণ পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। তবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সবার সহযোগিতা নিয়ে আগামী পাঁচ বছর ময়মনসিংহ-০৮ আসনের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো।”
তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমাদের সবার লক্ষ্য ছিল অবহেলিত এই জনপদের উন্নয়ন। আগামী দিনের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় তাদেরও আন্তরিক সহযোগিতা পাবো বলে আমি বিশ্বাস করি।”
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে জনগণ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের প্রস্তুতি নিন। কোন চাঁদাবাজী,-দ্বান্দ্বাবাজীকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না,অনিয়ম দুর্ণীতি করে জনগণের মধ্যে বিভেদ নয়,বরং ভালো ও জনকল্যাণমুখী কাজের মাধ্যমে তাদের নাঝে ঐক্য গড়ে তুলতে তিনি তার দলীয় নেতাকর্মী ও কর্মী সমর্থকদের প্রতি আহবান জানান।

