স্টাফ রিপোর্টার: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিপ্তরের কয়েকজন গুপ্ত জামায়াত কর্মকর্তার যোগসাজশে মাদ্রাসার প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা বেতন ইচ্ছাকৃত আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে- সরকারকে বেকাদায় ফেলতে ইচ্ছে করেই শিক্ষকদের বেতন বাজেটে ঘাটতি রেখেছে তারা । যারা এই ঘটনার ক্রীড়ানকের ভূমিকায় খেলছেন তারা সবাই গুপ্ত দলের সাবেক ছাত্রনেতা। তাদের মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব ২৪তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূঁঞা, মাদ্রাসা শাখার উপসচিব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রশিবির নেতা রাহাত মান্নান। এই রাহাত মান্নান কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের পিএস (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার নামে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ ও শিবির নেতা হওয়ায় ও জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টার বিষয়টি বুঝতে পেরে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এনডিসি তাকে পিএস পদ থেকে সরিয়ে দেন বলেও জানা গেছে।
শিক্ষকদের বেতন ভাতাদি আটকে রেখে শিক্ষকদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে শিক্ষক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফালানোর জন্যই এমন চক্রান্ত করা হচ্ছে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা।
এছাড়া মাদ্রাসা শাখার অতিরিক্ত সচিব এস. এম. মাসুদুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল শাখার শিবিরের সাবেক সভাপতি। অতিরিক্ত সচিব ও বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি মো. উবায়দুল হকও জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তা। মূলত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে চক্রান্তের মূলে এসকল কর্মকর্তার নাম গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
এদের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কয়েকজন জামায়াত-শিবির কর্মকর্তা এই ঘটনার সাথে জড়িত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অর্থ) ড. শফিকুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক ড. মো. ইসমাইল হোসেন ও সহকারী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ শুকুর আলম মজুমদার।
অভিযোগ উঠেছে-মাদ্রাসার শিক্ষকরা যখন বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন ঠিক সেই মুহূর্তে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) উবায়দুল হক অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েই কয়েকমাস যাবত তিনটি গাড়ি একাই ব্যবহার করছেন। একটি গাড়ি ব্যবহার করছেন নিজে, একটি স্ত্রী ও অন্যটি সন্তানের স্কুলে যাতায়াতের কাজে। হঠাৎ করেই তার এমন উত্থানে প্রশ্ন জেগেছে শিক্ষক নেতৃবৃন্দের মাঝে।
সুত্র জানিয়েছে-বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে আট হাজার দুইশ ২৯টি। এর মধ্যে দাখিল পাঁচ হাজার সাতশ ৬৭টি, আলিম এক হাজার দুইশ ৮৫টি, ফাজিল নয়শ ৯৩টি এবং কামিল একশ ৮৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী কর্মরত আছেন। ঈদুল আজহার আগেই মে মাসের বেতন প্রস্তুত করা হলেও সময়মতো অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়নি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের গুপ্ত কর্মকর্তারা। পরে জুনে প্রস্তাব পাঠানো হলেও অনুমোদন দেয়নি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে কর্মরত একই গুপ্ত চক্রের কর্মকর্তারা। এই চক্র গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে রটনা করেছে সরকারের তহবিলে টাকা নেই। টাকা না থাকলে বেতন হবে কোত্থেকে। মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে বিপদে ফেলায় তাদের আসল লক্ষ্য। এখানে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে বলি হচ্ছেন মাদ্রাসার প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী।
মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানান, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনের জন্য প্রতি মাসে ৫১১ কোটি টাকার প্রয়োজন। তবে ফান্ডে রয়েছে মাত্র ৮৬ কোটি। এ অর্থসংকটের কারণেই তাঁদের মে মাসের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্য মাসের মতো যথারীতি মে মাসের শেষ দিকে ওই মাসের বেতন-ভাতার কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল. যা জুনের শুরুতেই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থছাড় পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি যথাসময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। ঈদের ছুটি শেষে চলতি জুনের শুরুতে গত মাসের (মে) বেতনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা অনুমোদন দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের গুপ্ত চক্র।
চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব দাউদ মিয়াকে পদোন্নতি দিয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে সচিব পদে পদায়ন দেওয়া হয়। জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মাদ্রাসা অনুশাখায় কর্মরত সাবেক শিবির নেতা উপসিচব রাহাত মান্নানকে কৌশলে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সচিবের পিএস হিসেবে দায়িত্ব বাগানো হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সাবেক এই নেতা রাহাত মান্নান এতোটাই বঙ্গবন্ধু-প্রেমিক ছিলেন যে তিনি আওয়ামী আমলে বঙ্গবন্ধুর ছবি ফেসবুকে প্রোফাইল দিয়ে রাখতেন। ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের অতি ঘনিষ্ঠজন এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তালুকদার খালেক নিজে তদবির করে তাকে নিয়ে আসেন মোংলা উপজেলার ইউএনও হিসেবে। আওয়ামী জমানায় ছিলেন ‘গুপ্ত শিবির’। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর প্রকাশ্যে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক শিবির নেতা। জামায়াতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য পদায়ন নেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা , বিএমটিটিআই, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে জামায়াত রুকন সদস্য ও সাবেক শিবির নেতাদের পদায়নের নায়ক ছিলেন এই রাহাত মান্নান। অধিদপ্তর কিংবা বোর্ডে যেকোনো শিবির কর্মকর্তা অভিযুক্ত হলেই নানা কৌশলে তাদের রক্ষাকবচ ও ঢাল হয়ে দেখা দেন খোলস পাল্টানো এই গুপ্ত কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে সাংবাদিকদের ফোন কেটে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র-শিবিরের সভাপতি যুগ্মসচিব মনিরুজ্জামান ভূঁঞা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অঘোষিত ডন!
মনিরুজ্জামান ভূঁঞা যুগ্মসচিব হলেও মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের সাবেক সচিব খ ম কবিরুলের সময় তিনিই ছিলেন সর্বসেবা। অধ্যাপক ড. ইউনুস সরকারের সময়ে কোনো অতিরিক্ত সচিব তার ভয়ে কথা বলতে পারতেন না। তিনি যা বলতেন সেটাই ছিল আইন। কেননা তিনি সাংগঠনিকভাবে সচিবের অতি ঘনিষ্ঠজন। জাতীয় নির্বাচনে ছিলেন জামায়াতের অন্যতম একজন প্রভাবশালী ক্রীড়ানক। বর্তমানে মনিরুজ্জামান ১৮০০ ভবন উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক। এটি তার অতিরিক্ত দায়িত্ব। সবসময় এই পদে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও শুধু গাড়ি বিলাসের জন্য এই পদের দায়িত্ব নিয়েছেন মনিরুজ্জামান। মাদ্রাসার ১৮০০ ভবন উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি মনিরুজ্জামান ভূঁঞা ব্যবহার করেন। তার সকল কার্যক্রম জামায়াতকে প্রমোট করার জন্য তিনি করেন। তা তিনি সগৌরবে অহমিকা নিয়ে বলেন।
এছাড়া ভুয়া তদন্ত প্রতিবেদন ও ভুয়া এমপিও প্রদানে তার হস্তক্ষেপের অনেক নথি শিক্ষা সংবাদের প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে জামাতীকরণের সাথে সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুগ্মসচিব মনিরুজ্জামান ভূঞা শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, “এক নম্বর বিষয় হইল কেউ হয়তো রিপোর্ট টিপোর্ট করছে, সেটা তারা কীভাবে করছে সেটা তারাই জানে। এটা তাদের দায়িত্ব। আমার যেই দায়িত্ব সেটা হইল, আমাদের তিনটা শাখা আছে, একটা হইল মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, সেখানে যে ছুটিছাটাগুলা আছে সেগুলা আমার মাধ্যমে অতিরিক্ত সচিব হয়ে ডিজির কাছে যায়। আমার কোনো ডিসিশন দেয়ার বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নাই, হ্যাঁ? আমি হইতেছি একটা পোস্টাফিসের মতো। সিলেবাস বা কারিকুলাম এইটা তো হয় এনসিটিবি থেকে। এইটাতে আমাদের কোনো ক্ষমতা নাই। এইটা ওনারাই দেখে, এটা মাউশি, যেটা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, শেড যেটা আরকী তারা দেখে। আমার হলো বিএমটিটিআই, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, এগুলার মধ্যে ছুটি-ছাটা টাটা এগুলা আসে। তাও এগুলা আমার ডিসিশন দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নাই। অধিদপ্তর বা বোর্ড থেকে আমার এখানে আসে । আমি জাস্ট এগুলা ফরোয়ার্ড করে দিই। একটা পোস্টাফিসের মতো। আর বেতন টেতন ঐটাতে আমার কোনো কানেকশন নাই। ওইটা তো হলো আমাদের প্রশাসন শাখার এনআইএফ ম্যাডামের হাতে, অতিরিক্ত সচিব, অন্য শাখা, এটার সাথে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। এমপিও শাখা এটা দেখে।”
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ হয়তো রিপোর্টটাকে সুন্দর করার জন্য দিতে পারে তবে এই বিষয়টাতে আমার কোনো ক্ষমতা নাই। যাই হোক আপনি এই সব কিছু লেইখেন না। আপনাকে এইটা শুধু বোঝানোর জন্য বললাম যে, এইটার কোনো সত্যতা নাই। এইটার সাথে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। এইসব সরকারের সিদ্ধান্ত নেয় সচিব মন্ত্রীরা। আমাদের এটার কোনো ক্ষমতা নাই। দপ্তরপ্রধান, মনে করেন, মাদ্রাসা অধিদপ্তরের ডিজি তার কোনো ক্ষমতা থাকতে পারে, সচিবের কিছু ক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু সেকশন অফিসারও ফাইল নোট দেয়। কিন্তু আমি তো হইলাম ব্রাঞ্চচিফ। আমার এরকম কোনো ক্ষমতা নাই। আমার এ রকম কোনো মানসিকতা নাই। আমি সরকারি চাকরি করি। সরকার যা সিদ্ধান্ত দেয়, এর বাইরে আমার কোনো মতামত নাই, কোনো চিন্তা নাই। ঠিকাছে?’
তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অভিযোগ উঠলে তো আমার কিছু বলার নাই। …তদন্ত হইলে অভিযোগকারীর স্বাক্ষ্য-প্রমাণ তো সামনে আসবে। সেই স্বাক্ষ্য-প্রমাণ সামনে আসলে আমি সেই স্বাক্ষ্য প্রমাণের জবাব দিবো। স্বাক্ষ্য প্রমাণ দেওয়ার তো সুযোগই নাই। জামাতীকরণ বলতে তো বোঝাবে বদলি করা। অথবা সিলেবাস করা। বদলির তো আমার কোনো ক্ষমতা নাই। আমাদের মাদ্রাসার সব বদলি হয় সরাসরি মাউশি/শেড থেকে। সিলেবাস করে হচ্ছে এনসিটিবি, সেটাও হয় শেড থেকে। আমাদের তো ধরেন, আমাদের তো কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সেরকম কোনো ক্ষমতাই নেই।”
১৮০০ মাদ্রাসার ভবন উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার প্রসঙ্গে এই যুগ্মসচিব বলেন, প্রকল্পের গাড়ি তিনি ব্যবহার করেন না। ‘এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন মাসুদ স্যার। ওনাকে বদলি করা হয়েছে। এখন পরিচালক হইল শামসুর রহমান স্যার। এই বিষয়ে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই।’
মাদ্রাসা শিক্ষকরা বেতন না পেলেও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উবায়দুল হকের গাড়িবিলাস
মাদ্রাসার শিক্ষকরা যখন বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন ঠিক সেই মুহূর্তে মাদ্রাসার শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) উবায়দুল হক অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েই কয়েকমাস যাবত তিনটি গাড়ি একাই ব্যবহার করেন। একটি গাড়ি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের গাড়ি, যা উবায়দুল হক ব্যবহার করছেন। মাদ্রাসা শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষার প্রসারে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অব মাদ্রাসা এডুকেশন স্কিম’ এর স্কিম পরিচালকের জিপ গাড়িটি তার বউ ব্যবহার করেন। এছাড়া একই স্কিমের আরেকটি মাইক্রোবাস তিনি সন্তানদের আইডিয়াল স্কুলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। তিনি সরকারি ঋণ নিয়েও গাড়ি কিনেছেন। ডিজি মহোদয় ব্যস্ত গাড়ি বিলাসে। শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না সেদিকে তার খেয়াল নেই। কারণ শিক্ষকরা বেতন না পেলে এই শিক্ষকদের মাধ্যমে সাধারণ জনতা জানবে এই সরকার ব্যর্থ। তাদের কোষাগারে কোনো অর্থ নেই। অর্থ থাকলে বেতন কেন পাবেন না? এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলাই মাদ্রাসা ডিজির প্রধান উদ্দেশ্য।
মাদ্রাসার প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা বেতন না দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে ৩টি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গ, আপনি সরকারি কয়টা গাড়ি ব্যবহার করেন এবং আপনার কয়টি গাড়ি ব্যবহারের প্রাপ্যতা রয়েছে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই আপনি যথা সময়ে বেতনের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেননি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উবায়দুল হককে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন এই মহুর্তে কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।
শিক্ষা জামাতিকরণের প্রেক্ষাপট
ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুর রশীদ তার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক শাখায় খ ম করিরুলকে বদলি করে নিয়ে আসেন। এই কবিরুল ইসলাম ৫ আগস্টের আগে সিনিয়র সহকারী সচিব থাকলেও জামায়াতের কোটায় এক মাসের ব্যবধানে তিন ধাপ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব, দুই মাসের মাথায় সচিব ও সিনিয়র সচিব পদোন্নতি পান এবং পরবর্তীতে হয়ে অবসরে যান। খ ম কবিরুল ছিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য। শিক্ষায় জামায়াত-শিবির কর্মকর্তাদের কৌশলে পদায়নের জন্য বদলিতে বৈষম্য দূর করতে কমিটি গঠন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের শিক্ষা সচিব আব্দুর রশিদ (পরবর্তীতে মন্ত্রী পরিষদ সচিব)। ওই বৈষম্যের নামে গঠিত বদলি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন খ ম কবিরুল ইসলাম। যার ফলে শিক্ষার সকল স্তরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), পরিদর্শন ও নীরিক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএমই). বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরসহ শিক্ষার সকল অফিসে একচেটিয়াভাবে জামায়াত পন্থী ও সাবেক শিবির করা কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। বদলি পদায়নে উপেক্ষিত থাকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার কর্মকর্তারা। শিক্ষার সকল স্তরে জামায়াতীকরণের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এই খ ম কবিরুল ইসলাম। বদলি বাণিজ্যে কবিরুলের অন্যতম সহযোগী ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের কলেজ শাখার তৎকালীন যুগ্মসচিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির সভাপতি নুরুজ্জামান ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূঁঞা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতা উপসচিব রাহাত মান্নান।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি উবায়দুল হক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব মনিরুজ্জামান ভূঁঞা ও উপসচিব রাহাত মান্নান, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অর্থ) কে এম শফিকুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক ড. মোঃ ইসমাইল হোসেন ও সহকারী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ শুকুর আলম মজুমদার এরা সবাই সাবেক শিবির নেতা ও জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ও অভিযোগ রয়েছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের জামায়াতপন্থী এই কর্মকর্তারা বিএনপির নেতৃত্বে চলা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা যথাসময়ে উপস্থাপন করেননি। কেন দেওয়া সম্ভব হয়নি এমন প্রশ্নে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মোঃ দাউদ মিয়া এনডিসি শিক্ষা সংবাদ’কে জানান, ‘তাদের একটা দিনব্যাপী ওয়ার্কশপ চলছে। এ মুহূর্তে কথা বলতে পারছেন না।’
শিক্ষকদের বেতন না দিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা, শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের গাড়িবিলাস এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে জামায়াতীকরণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষকদের পেশাজীবী ও অরাজনৈতিক বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন-এর কেন্দ্রীয় মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, ‘মাদ্রাসার শিক্ষকরা এখনও মে মাসের বেতন পায় নাই। তারা এখন বলতেছে যে বাজেটে টাকা নাই, বাজেটে টাকা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা যদি আগে এটা পদক্ষেপ নিতো, তাইলে অবশ্যই গভমেন্ট কোনো ব্যবস্থা নিতো। তারা কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেয় নাই। একটা চিঠি ছেড়ে দিয়ে তারা দায় সেরে ফেলছে।’
কর্মকর্তাদের গাড়িবিলাস নিয়ে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। কারণ আমি অধিদপ্তরে যাইও না। খোঁজখবরও নেই না। অধিদপ্তরে ডিজি নাই বহুদিন। এখন একজন ভারপ্রাপ্ত ডিজি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছে। এখানে একজন পারমানেন্ট, যোগ্য, চৌকস ডিজি দরকার। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আমরা আশা করছিলাম যে গভমেন্ট জরুরি ভিত্তিতে এটা পরিচালনার জন্য একজন চৌকস এবং দক্ষ এবং ভালো একজন কর্মকর্তা দিবেন। মাদ্রাসা অধিদপ্তরটা পরিচালনার জন্য। কিন্তু সেটা এখনও হয় নাই।’
মাদ্রাসা শিক্ষাকে জামায়াতীকরণ প্রসঙ্গে মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী বলেন, ‘আসলে এটা আমাদের শোনা কথা যে আগে গভমেন্টের সময়, ওই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ইউনুস সরকারের সময়, কিছু কর্মকর্তা এখানে ঢুকছেন, এবং এখনও ওনারা আছেন এখানে। সবাই বদলি হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ওনাদের ব্যাপারে শোনা যাচ্ছে, কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজ করতেছেন। এটা তো অবশ্যই কোনো যোগ্য, দক্ষ এবং কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য যারা এখানে আছে তাদের এখানে থাকা উচিতও না। সরকারেরও উচিত এই পিছিয়ে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অরাজনৈতিক, যোগ্য এবং দক্ষ, মেধাবী কর্মকর্তাদের এখানে দেওয়া। যাতে করে, এই শিক্ষাব্যবস্থাটা একটা সুন্দর পরিবেশ পেয়ে সুন্দর অবস্থান তৈরি করতে পারে। গভমেন্টের নলেজে আনা উচিত। গভমেন্ট এই বিষয়টা যদি বিবেচনা করে যে, যারা রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা করে, তাদের এখানে রাখলে হবে না। মাদ্রাসা শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য সেটা ব্যাহত হচ্ছে।’

